বিনোদন

আপনি কি শিল্পী না কি ফলোয়ার ??

গুলজারের কথা উঠলেই মানুষজন ‘মেরা কুছ সামান’ অথবা ‘তেরে বিনা জিন্দেগি সে’ এইসব গানের উল্লেখ করেন, কিন্তু গুলজার কত মহান শিল্পী সেটা প্রমাণ হয় তার আইটেম গানের মাধ্যমে।

‘গোলি মার ভেজে মে’ – লাইনটা শুনলেই মনে হয় কি বিচ্ছিরি জঘন্য বস্তির মত লিরিক্স, কোনো গভীরতা নেই, লালিত্য নেই। কিন্তু পরের লাইনেই গুলজার স্ট্রেট-কাট মারছেন – ‘কে ভেজা শোর করতা হে’। পরের লাইনেই ওভার বাউন্ডারি – ‘ভেজে গি শুনেগা তো মরেগা … ‘

অথবা ‘বিড়ি জালাই লে জিগার সে পিয়া’ – আরও একটা প্রায় অশ্লীল বিতর্কিত গান। সুশীল সমাজে গেল গেল রব তোলা এই গানের পরের লাইনেই গুলজার লিখছেন – ‘জিগর মে বড়ি আগ হে’।

একজন প্লেয়ারকে চেনা যায় কমফর্ট জোনের বাইরে গিয়ে সে কত ভালো খেলে – তা দিয়ে। চেনা পিচে সবাই শের। বিদেশের মাটিতে ক’টা সেঞ্চুরী করেছো হে ছোকরা !!

প্রেমে ধোকা খেয়ে ‘তোমাকে ছাড়া কোথায় যামু / এ জীবন কোথায় পামু’ মোটামুটি সবারই ভালো লাগে। সহজে জনপ্রিয় হয়ে যায়। কিন্তু ‘কি আর করবো বলো সখি / বুঝেছি প্রেম টেম সবই বুজরুকি’ একমাত্র সাহসীরাই লিখতে পারে যারা হাততালির তোয়াক্কা করে না।

আমি মনে করি একজন শিল্পী তার শিল্পে কল্পনাকে প্রশ্রয় দেবে, সত্যকে না।

এখানে একটা কন্ট্রাডিক্টারি আছে – রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ‘শিল্পকে সুন্দর হতে হবে’। তার প্রেক্ষিতে ঋত্বিক ঘটক বলেছেন ‘তারও আগে শিল্পকে সত্য হতে হবে’। ঋত্বিকের সত্য আসলে মরালিটির দিক থেকে, আইডিওলজির ক্ষেত্রে, ধরা যাক একজন ভগবানে বিশ্বাস করে না, কিন্তু পয়সা পেয়েছে তাই চারটে শ্যামাসঙ্গীত লিখে দিল – এই অসত্য থেকে দূরে থাকতে বলেছেন ঋত্বিক ঘটক।

আমি এখানে যে কল্পনার কথা বলতে চাইছি সেটা গঠনগত দিক থেকে, প্রেজেন্টেশনের দিক থেকে। উদাহরণ দিয়ে বোঝাই – The Sky is Pink সিনেমায় বাচ্চাটা স্কুলের এক ছবিতে আকাশের রঙ গোলাপি করায় দিদিমণি বলেছে আকাশের রঙ নীল হয়, নীল করো। এখানে আকাশটা সত্য কিন্তু রঙটা কল্পনা। বাচ্চাটা দিদিমণির কথা শোনে নি। আপনিও শুনবেন না। আশেপাশে প্রচুর দিদিমণি পাবেন, অনবরত বলবে – এই হলে এই হয়, এটা এরকমই হয়, ওটা ওরকমই হয়। এটা এরকম করো, ওটা ওরকম করো। আপনি জাস্ট ইগনোর করুন, তারা কেউ শিল্পী নয় তারা প্রত্যেকে ফলোয়ার। আগের শিল্পী যা করে গেছে এরা হুবুহু সেটা ফলো করে। গান ‘তোলার’ মত, গান ‘শেখার’ সাথে যার কোনো সম্পর্ক নেই।

একজন শিল্পীর মূলমন্ত্র সুকুমার রায় বহু বছর আগেই লিখে রেখে গেছেন।

“আজকে দাদা যাবার আগে
বল্‌ব যা মোর চিত্তে লাগে
নাই বা তাহার অর্থ হোক্
নাই বা বুঝুক বেবাক্ লোক
আপনাকে আজ আপন হাতে
ভাসিয়ে দিলাম খেয়াল স্রোতে”

শিল্পীরা শিল্পী হয়েই থাকুন। ফর্ম ভাঙুন। নতুন ফরম্যাট তৈরী করুন। হাততালির জন্য নয়, আগামীর জন্য কাজ করুন।

উপরের ছবিটি(Svanen, 1915) সৃষ্টি করেছেন – Hilma af Klint

এত ভাটের কথা এই ছবিটা দেখেই মনে হলো। কত সহজে একটা ফরম্যাটকে নির্বিকারে ভেঙে দিচ্ছেন।

আর একটা ছোট্ট উদাহরণ না দিয়ে থামতে পারছি না, প্রথম যখন সিনেমা শুরু হয়, ক্যামেরা একটা সিমেন্টের বেদীতে গাঁথা থাকতো। অভিনেতারা ক্যামেরার সামনে অভিনয় করতো, নড়ে চড়ে বেড়াতো। একজন যুবক ‘David Wark Griffith‘ এসে বললো – সিমেন্টের বেদীটা ভাঙুন, আমি ক্যামেরাকে মুভ করাবো, আর্টিস্ট এক জায়গায় বসে থাকবে।

আমি নিজে বাই প্রোফেশন একজন এডিটর এবং এই এডিটিং-এর সৃষ্টিকর্তা বা জনক হলেন এই ভদ্রলোক। এখন সিনেমাতে আমরা যা যা দেখি – যেমন ফ্লাশব্যাক, মুভিং শট, প্যারালাল সিন ইত্যাদি প্রায় সমস্ত কিছুই তার সৃষ্টি। সিনেমা যে ‘বই’ নয়, ‘থিয়েটার’ নয় – সিনেমার যে নিজস্ব ভাষা আছে, ফরম্যাট আছে সেটা বুঝেছিলেন এবং বুঝিয়েছিলেন এই ব্যক্তি।

আপনি কখনও এরকম ফরম্যাট ভেঙেছেন ?? না কি আগে যা হয়ে গেছে সেটাই ফলো করে যাচ্ছেন। গান শিখছেন নাকি গান তুলছেন ??

শুধু শিল্পে নয়, সমাজের সব ক্ষেত্রেই ফর্ম ভাঙা প্রয়োজন। বিদ্যাসাগর এসে বললেন শুধু ছেলেরা কেন পাঠশালায় যাবে !! মেয়েরাও যাবে। – এটা নিয়ে কথা হবে অন্য কোনো দিন, অন্য কোনো পোস্টে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *