সামাজিক

Free মানেই কিন্তু সে Free নয়

এই যে jio কোম্পানী সক্কলকে freeতে internet করতে দিচ্ছে আর অগা পাবলিক আনন্দে দু’কুল ভাসিয়ে দু-বাহু উর্দ্ধে তুলে ‘free free’ করে নাচছে তাদের জেনে রাখা ভালো কিছুই free নয়। freeতে এখানে কিছুই মেলে না। আমার বাবা খুব জল খেতে পারে, জল খায় আর বলে, বিনে পয়সার জল, জলের মত শান্তি কিছুতে নেই। এখন আর সেকথা সেই উৎসাহ নিয়ে বলে না। গরীব লোক, তাই জলও এখন বুঝে বুঝে হিসেব করে খেতে হয়। সেই তৃপ্তি নেই। এখনকার নাতি-পুতিরা বিনে পয়সায় internet-এ পানু video আর অশ্লীল জোকস শেয়ার করে হেব্বী তৃপ্তি পায়। তারা জল বিশেষ খায় না। যাই হোক, সমাজ নিয়ে বেশী লেকচার দিয়ে লাভ নেই, ওটা দিন দিন গোল্লায় যাচ্ছে। আরো যাক।

যা বলছিলাম, আসলে কোনো কিছুই free নয়। আপনি নিশ্চয় ভাবছেন ব্যাটা কয় কি, সেই সাড়ে পাঁচ মাস ধরে দু-বাহু উর্দ্ধে তুলে jio jio করে গেলাম, কত বউদিকে পটালাম, এক টাকা খরচা হল না!! তাহলে আসুন একটু সোজা করে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেওয়া যাক।

ধরা যাক, বিলাসবহুল বাবুর ‘আসুন দাদা খেয়ে দেখুন’ বলে একটি হোম ডেলিভারী শপ আছে। এই ‘আসুন দাদা খেয়ে দেখুন’ সংক্ষেপে এডিকেডি দোকানের বেশীর ভাগ খদ্দের অনলাইনে খাবার বুকিং করে। ধরা যাক, এই দোকান প্রতিদিন মোট ১০০ টি করে অর্ডার পান। এই ১০০ জনের মধ্যে ২০ জন হয়ত এয়ারটেলের গ্রাহক, ১৫ জন আইডিয়ার, ২৫ জন ভোডাফোনের, ১২ জন বিএসএনএল ইত্যাদি কোম্পানীর, মোদ্দা কথা নানান network থেকে ডেলিভার। এবার যেই বাজারে freeতে jio এলো, অমনি লালু ভুলু ক্ষেদি টেপি সকলে jio নিয়ে নিল।

jio বাজারে আসার পর বিলাস বাবুর সেই এডিকেডি দোকানের খদ্দের কিন্তু সেই ১০০ই রয়েছে, বাড়েও নি, কমেও নি। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে দেখা গেল যে আগে যেখানে নানান network থেকে খদ্দের এন্ট্রি নিচ্ছিল এখন ১০০ জনের মধ্যে ৮৫জনই jioর network use করছে। এতে অবশ্য বিলাসবাবুর কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু অসুবিধা এই হবে। কিভাবে ?

আসুন বুঝিয়ে দিই। jio কোম্পানী থেকে বিলাসবাবুর বাড়িতে ফোন গেল, jio কোম্পানীর ফোন পেয়ে তিনি আহ্লাদে আটখানা হলেন এবং তাদের প্রস্তাব শুনে আটাত্তর খানা হয়ে গেলেন। jio বিলাসবাবুকে প্রস্তাব দিয়েছে, jio network থেকে যত অর্ডার বিলাসবাবু পাবেন, তার ৫% jio কে দিতে হবে।

  • এ কেমন অদ্ভুত আবদার ? খদ্দের আমার, খাবার আমার, তোমাকে কেন খামোকা ৫% দালালী দেব ??
  • দেখুন, আপনি যদি আমাকে কমিশান না দেন, তাহলে আমরা কিন্তু আপনার পাশেই ‘যত খুশী খেয়ে যান’ দোকানকে আমাদের অফার দিয়ে দেব।

বিলাসবাবু মুখ বেঁকিয়ে বলল, যা খুশী করুন, আমি কমিশান দেব না।

পরদিন থেকে বিলাসবহুল বাবু থ। কি ইয়ার্কি মাইরি !! খদ্দের কমে যাচ্ছে। আগে দিনে ১০০ হত, এখন ১৫। jio থেকে যে ৮৫ জন খদ্দের আসছিল তারা এখন কেউ আসছে না। ব্যাপার কি ?? এরকমটাও কি হতে পারে ????

আজ্ঞে হ্যাঁ, হতে পারে। বুঝিতে দিই। jioর টেকনিকাল টীম কি করল, বিলাসবাবুর সার্ভার এবং ডোমেইনকে স্লো করে দিল। অর্থাৎ যদি কেউ বিলাসবাবুর সাইটে খাবার অর্ডার করতে যায়, তাহলে সেই সাইট এত্ত স্লো হয়ে যাবে যে খদ্দের বিরক্ত হয়ে অন্য সাইটে চলে যাবে।

গুগলের একটি রিপোর্ট বলছে, যে সাইটের পেজ খুলতে ১৫সেকেন্ডের বেশী সময় লাগে, প্রায় ৯০% শতাংশ মানুষ সেই সাইটকে এড়িয়ে চলে।

আচ্ছা jioর কি এই ক্ষমতা আছে, যে সে কোনো একটি নির্দিষ্ট ডোমেইনকে স্লো করে দেবে ?? আজ্ঞে আছে। কারণ দোকানের সাইটটি বিলাসবাবুর হতে পারে কিন্তু যে network আপনি use করছেন সেটা jioর নিজের। এমনকি jio এটাও করতে পারে, যেই আপনি এডিকেডি’র সাইট খুলতে যাবেন, অমনি দেখবেন jio আপনাকে নোটিশ পাঠাবে, যে ওখানে কেন যাচ্ছেন ওরা বড্ড স্লো, এখানে আসুন এরা ফাস্ট। আর আমরা সবাই জানি, এখন কেউ ভালো চায় না, সবাই ফাস্ট চায়। সে প্রেমে পড়েই বিছানাতে ধপাস হোক, আর বাইকে চড়ে বাইপাস।

এবার আপনি ভাবছেন, এতে আমাদের কি লোকসান হল, আর jioরই বা কত লাভ হল। আচ্ছা এই এডিকেডি সাইট যদি ফ্লিপকার্ট হয় , অথবা আমাজন। তাহলে ২% কমিশানে কত ইনকাম হতে পারে jioর সেই আন্দাজ আছে আপনার ??

আপনি ভাবলেন, এতে আমার কি লোকসান ? আপনি সত্যি বোকা। একটু লেবু খান। ফ্লিপকার্ট বা বিলাসবাবু কি ছাগল, তিনিও ব্যবসা করতে বসেছেন। তিনি তার লাভের দু-পয়সা আপনার ঘাড় ভেঙ্গেই নেবেন।

আপনি ভাবছেন, আমি অনলাইনে কিছু কিনবই না। সত্যি ?? jio use করবেন আর অনলাইন শপিং করবেন না ?? আচ্ছা মেনেই নিলাম, আপনি করলেন না।

একটু অন্যভাবে আসি।

আপনি কি অনলাইনে খবর পড়েন ?? কোন পেপার পড়েন, ধরলাম ইন্ডিয়া টাইমস। jio হয়ত ইন্ডিয়া টাইমসের সাথে চুক্তি করল, ইন্ডিয়া টাইমসের স্পীড তারা অন্যদের তুলনায় বেশী ফাস্ট করে দেবে। ইন্ডিয়া টাইমস সানন্দে রাজী হল, শুধু বিনিময়ে তাদের অনলাইন এবং ছাপা কাগজে jioর অ্যাপগুলির বিনে পয়সায় প্রচার করতে হবে। এবার আপনি যখনই jio থেকে ইন্ডিয়া টাইমস পড়ছেন, তখনই বারবার অ্যাপ ডাউনলোড এবং আপডেটের নোটি পাচ্ছেন। আপনি ভাবলেন, অ্যাপ তো freeতে পাচ্ছি। ঠিক, কিন্তু অ্যাপ চলাকালীন যে বিজ্ঞাপনগুলি আপনি দেখতে বাধ্য হচ্ছেন সেগুলির জন্যে jio টাকা পাচ্ছে। অবশ্য অকারণে অ্যাড দেখাকে যদি আপনি বিরক্তির কারণ না মনে করেন তাহলে সেটি আলাদা কথা।

সর্বোপরি, একটু সামাজিক বাতেলা মেরে শেষ করি, ধরা যাক বিনে পয়সায় ডেইলি পানু দেখার জন্যে এবং পাশের বাড়ির কাকীমার সাথে হোয়াটসঅ্যাপে নোংরা জোকস শেয়ার করতে গিয়ে এটুকু ঝক্কি পোঁয়াতে আপনি রাজী। কিন্তু দাদা, আপনার ঘাড়ে যে স্পন্ডেলাইটিস হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশে প্রজাপতি কমে যাচ্ছে। শরতের মেঘ মোবাইলের স্ক্রীনে GIF হয়ে নয়, আকাশে নৌকো হয়ে উড়ে যাচ্ছে। আপনি কিছু মিস করে যাচ্ছেন না তো ??

লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করবেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *