সামাজিক

স্বাস্থ্যদপ্তরের কল্যাণ হোক।

বাবা ভর্তী ছিল, সপ্তাহখানেক ধরে দিনের বেশীরভাগ সময় আর জি কর হাসপাতালে কাটানোর পর কিছু জিনিস খুব চোখে লাগলো। সেটা নিয়েই একটু আলোচনা করব এখানে। সকলের জানা জরুরী। গরীব মানুষ অনেক আশা নিয়ে নিরূপায় হয়ে সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসার জন্যে যায়। কেউ ফিরে আসে সুস্থ হয়ে, কেউ ফিরে আসে না।

আর জি করের বাইরে বড় বড় নোটিশবোর্ডে বোল্ডে লেখা আছে রুগীর সাথে মাত্র একজন। মাত্র একজন। একজনের বেশী রুগীর সাথে থাকবেন না, বসবেন না, ভীড় করবেন না। নিশ্চিতভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত। জনারণ্য হাসপাতালে এটাই সঠিক নিয়ম। হাসপাতালটা হাসপাতালই, অ্যাকোয়াটিকা নয়। শ্রীভূমির পুজোও নয়। সিকিউরিটিও এখানে ভীষণ ভাবে দক্ষ। বর্ডার টপকে মানুষ চলে যেতে পারে, কিন্তু এদের টপকে একজন রুগীর সাথে দুইজন ব্যাক্তি হাসপাতালের ভিতর প্রবেশ করতে পারবে না।
ব্যবস্থা ভালো। তবে ঐ আর কি !!!

আপনার আত্মীয় যিনি এখানে রুগী, তিনি হাসপাতালের বেডে শুয়ে। বড় ডাক্তার ভিজিটে আসবে, তিনি আপনাকে রুগীর ওষুধের কথা বলবে। কোনো রকম টেস্ট বা অন্য কিছু করতে হবে কি না বা ইত্যাদি শোনা এবং জানার জন্যে আপনাকে রুগীর সাথে সর্বক্ষণ থাকতে হবে। থাকাটা স্বাভাবিক এবং উচিতও।

আপনিও যথাসম্ভব প্রহরীর মত অষ্টপ্রহর লেগে রয়েছেন রুগীর সাথে। যখন আপনি রুগীর সাথে রয়েছেন তখন আপনি মানুষ না, এবং আপনার আর কোনো কাজ থাকে না, আচ্ছা কাজ ছেড়ে দিন, আপনার ক্ষিদে পায় না, পেচ্ছাপ পায় না, পায়খানা পায় না। কারণ আপনি যদি ২৩ ঘন্টা ৫৯ষাট মিনিট ৪২সেকেন্ড রুগীর পাশে বসে থাকেন এবং মাত্র ১৮ সেকেন্ডের জন্যে রুগীর কাছছাড়া হন, নিশ্চিত থাকুন, বড় ডাক্টার তখনই রুগীকে ভিজিট করতে আসবে।

আপনার মনে হতে পারে, বড় ডাক্টার নিশ্চয় সিসিটিভির সামনে নজর রেখে বসে ছিল, কখন আপনি একটু রুগীকে রেহাই দেবেন আর সেই ফাঁকে ডাক্টার এসে আপনার রুগীকে চারটে ‘পরামর্শ’ দিয়ে পালাবে।

ডাক্টার কখন ভিজিটে আসবে সেটা কেউ জানে না। আয়া, সিস্টার তো বাদ দিলাম, জুনিয়ার ডাক্টারও জানে না। বড় ডাক্টার নিজেও জানে বলে বোধহয় না। অনেকটা আমশার পাতলা ফিনফিনে পায়খানার মত বড় ডাক্টারের আবির্ভাব হয়। পুচুৎ করে আসে এবং পালায়।

গোটা স্বাস্থ্য দপ্তরের কাছে আমার প্রথম প্রশ্ন – বড় ডাক্টার কখন আসবে সেটা কেন ফিক্সড নয় ?? ধরে নিলাম সেটা ফিক্সড হওয়া সম্ভব নয়, কারণ যে কোনো মুহুর্তে তাকে অপারেশান ইত্যাদি জরুরী কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তে হতে পারে। তবুও কেন একটা নির্দিষ্ট সময়ের বাঁধনে সেটা রাখা নেই। আপনি যে কাউকে জিজ্ঞেস করুন, কেউ বলবে, আটটায়, কেউ বলবে দশটায়, কেউ বলবে আজ আর আসবে না এবং বাকী বেশীরভাগ লোক বলবে ‘আমি জানি না’। ‘আমি জানি না’। হাসপাতালে চাকরী করতে হলে বোধহয় এই মন্ত্রবাক্যটি সবাইকে শিখে নিতে হয়।

রুগীর সাথে যে লোকটা বসে আছে, সে কি মাদাম তুসোর মিউজিয়ামের মোমের পুতুল ?? অনুগ্রহ করে বড় ডাক্তারের আসার সময় ফিক্সড করুন অথবা কখন আসবে সেটা আগে থেকে জানানোর ব্যবস্থা করুন।

এবার এর থেকেও ভয়ঙ্কর একটা ব্যাপারে সকলের নজর আনতে চাই। রুগীর সাথে আপনি আছেন। হঠাৎ কেউ এসে একটা টেস্ট টিউবে রুগীর রক্ত নিয়ে আপনার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলবে অমুক বিল্ডিং-এর চারতলা থেকে অথবা ৪ কিমি দূরের ল্যাব থেকে এটা টেস্ট করিয়ে আসুন। আপনিও পড়িমরি করে ছুটলেন, গিয়ে দেখলেন প্রায় আটষট্টি জনের পিছনে আপনি দাঁড়িয়ে।
তবুও শুকনো মুখে রক্ত জমা দিয়ে যখন প্রায় ৪০ মিনিট কি এক ঘন্টা পরে রুগীর কাছে ফিরলেন, দেখবেন যে এই ৪০ মিনিটে সিস্টার এসে আপনার রুগীর বিছানায় ওষুধের প্যাকেট ফেলে চলে গেছে, অথবা বড় ডাক্টার রাউন্ডে এসে ঘুরে গেছে, তিনি আবার ২৪ ঘন্টা পরে আসবেন, এমনকি নাও আসতে পারেন।

যাই হোক, আপনি ব্যাজার মুখ করে সিস্টারের কাছে ওষুধ নিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন,

– দিদি, কোনটা কিভাবে খাওয়াবো ?
– এতক্ষণ কোথায় ছিলেন ? সবাইকে বলা হচ্ছে রুগীর পাশে একজনকে সবসময় থাকতে।
– ডাক্টার রক্ত জমা করে আসতে বলেছিল, সেখানে গেছিলাম।
– তাড়াতাড়ি আসতে পারেন না ??

এদের সাথে বেকার তর্ক করে রুগীকে মেরে ফেলে লাভ নেই, স্বীকার করে নিন যে আপনি ভুল করেছেন তবে যদি দয়া করে এরা আপনাকে আর একবার ওষুধ খাওয়ানোর নিয়মটা বুঝিয়ে দেন।

বাবাকে নিয়ে প্রথম যেদিন ভর্তী করলাম, সেদিন এক সিস্টার অন্য এক রুগীর আত্মীয়কে বলল, ‘রুগীর হাতে চ্যানেল আছে ? এই স্যালাই্নের বোতল রুগীর হাতে লাগিয়ে নিন।’ বেচারী মহিলা কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, ‘দিদি আমি স্যালাইন লাগাতে পারি না।’ যেভাবে স্কুলের দিদিমণি দুষ্টু ছাত্রকে ধমক দেয়, সেইরকম কায়দায় সিস্টার সেই বেচারীকে ধমক দিয়ে বলল, ‘এতদিন ধরে লাগাচ্ছি, শিখে নাও নি কেন ??’

এইটুকু শুনে আমার হৃৎপিন্ড ছ্যাৎ করে উঠল। হয়ত সেদিন খুব বেশী দূরে নেই, ডাক্তার ছুঁড়ি কাঁচি হাতে ধরিয়ে বলবেন, নিন অপারেশানটা করে নিন। এতদিন ধরে শিখে নেন নি কেন ?

ভুল হয়ে গেছে ডাক্তার বাবু। অন্যায় হয়ে গেছে। এবার থেকে হাসপাতালে রুগী নিয়ে আসার আগে অপারেশান করা শিখে আসব, কি করে দেড়ফুট বাই পাঁচফুট বিছানায় দু’জনের জায়গা করে নিতে হয় শিখে আসব। কি ভাবে একইসাথে রুগীর পাশে বসে থেকেও ঐ একই সময়ে চল্লিশ মিনিট দূরের ল্যাবে রক্ত জমা করে আসতে হয় শিখে আসব। আপাতত দোষ না করেও ‘ভুল হয়ে গেছে’ বলাটা যখন শিখে নিতে পেরেছি। বাকিটাও শিখে নেব ডাক্টারবাবু।

এটা শুধু আর জি করের ঘটনা নয়, আন্দাজ করে নেওয়া যায় রাজ্যের তথা দেশের সমস্ত সরকারী হাসপাতালের এই রকমই অবস্থা। এটা কোন সরকার ক্ষমতায় আছে সেই দিয়ে শুধরাবে না। এটা রাজনৈতিক নয়, সামাজিক এবং মানবিক সুস্থতার পরিচয়। সমস্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্দেশ্যে অনুরোধ, অনুগ্রহ করে মানবিকতার প্রথম পাঠ নিয়ে তবেই কর্মক্ষেত্রে যোগ দিন। সঠিক চিকিৎসার আগেও সঠিক ব্যবহার জরুরী।

কিন্তু যেক’টা দিন মানুষ ওখানে থাকে তারা যেন ভালো ব্যবস্থা না পেলেও ভালো ব্যবহারটুকু পায় সেটা একটু দেখুন প্লীজ। স্বাস্থ্যদপ্তরের কল্যাণ হোক।

লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করবেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *