Prabir Kundu Header

সুখী মানুষের সেরা সময়

First Published On 12th Aug, 2015,
Published Here On 12th Jan, 2017

সেই চোদ্দ পনের বছর বয়সের দিনগুলো, যখন ডানাটা গজিয়েছে সবে, যখন এই চেনা বৃত্ত থেকে উড়ে বেরিয়ে যাওয়ার স্বপ্নে আচ্ছন্ন এই মন। যখন খবরের কাগজে সামান্য কিছু বিজ্ঞাপন। সেই সময়টাই তো সেরা সময়, আমার সময়, সেই সময়ের গান, সেই সময়ের সিনেমা, সেই সময়ের কবিতা, সেই সময়ের রিক্সাওয়ালা, দোকানদার, কন্ডাকটার, সেই সময়ের আকাশ, সেই সময়ের বৃষ্টি, সেই সময়ের গরম, সেই সময়ের আম, সেই সময়ের ইলিশ, সেই সময়ের অষ্টমী, সেই সময়ের কালিপটকা। প্রথম সমুদ্র দেখা কিশোর ছেলেটার মুখ হা হয়ে আছে। বালির উপর প্রথমবার লিখছে নিজের নয়, নিজের প্রেমিকার নাম। সেইটাই তো সেরা সময়। ফিরতে হলে সেখানেই ফিরব। এই নরকবাস তো সাময়িক মাত্র।

Couple with One Umbrellaএকটাই কোনো ছাদের থেকে উড়ছে এ পাড়ার সবক’টা ঘুড়ি। ঘুড়িতে ঘুড়িতে ঢেকে যাচ্ছে আকাশ।সাদা ধবধবে কাগজে কারো হাতের লেখায় নিজের নাম। সাথে লালকালীতে করা কারুকাজ। বুকপকেটের কুঠুরীতে বহুদিন সযত্নে তুলে রাখা ছিল সেই সম্পদ। তারপর কাগজের গুড়ো একদিন উড়ে যায় বসন্তের হাওয়ায়। আহা সে কি সময় ছিল। স্কুলের টিফিনে বারান্দা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া এরোপ্লেন। জানলা দিয়ে ভাসিয়ে দেওয়া কাগজের নৌকো। ছুটে এসে রাস্তায় পড়ে থাকা জলের বোতলে ফুটবলের শট। ঘরের দেওয়ালে শচীনের ফটো, তাতে সঙ্কেতে লিখে রাখা কারো নাম। ডায়রীর শেষ পাতায় টুকে রাখা পাশের বাড়ির ফোন নম্বর। খবরের চ্যানেলের লোগোতে নয়, মনে মনে হিসেব রাখা পুজো আসতে আর মাত্র বাকি ১৯ দিন। বয়স যখন ১৫, অথবা ১৬, কারো কারো হয়ত ১৭। লুকিয়ে সিগারেট। দুপুরে কারো ফাঁকা বাড়িতে চাঁদা তুলে ভাড়া করে আনা ভিসিআরে পর্ণোগ্রাফি।

ছাদের কোণায় দাঁড়িয়ে লুকিয়ে দেখা বহু দূরের কোনো বাড়ির ছাদে কাপড় মেলতে আসা মেয়েটিকে। বিকেল বেলায় রেলগেটের সামনে আসতে পারবে ? তুমি এলে না। কেন এলে না? এলে দেখিয়ে দিতাম প্রেম কাকে বলে? এই যে দুপুরবেলায় একঘেঁয়ে সিরিয়ালে ডুব দিয়েছ, সত্যি করে বলো তো, খুব কি সুখে আছ? সেদিন তোমায় নিয়ে পালিয়ে যেতাম ঠিক। স্বপ্নের দেশে। আমার তখন ১৭, তোমার সামনে মাধ্যমিক। এখন মধ্যবয়সের দোরগোড়ায় স্মৃতীতে নস্টালজিক।

ঝাঁ চকচকে শপিং মলের পাশে পলেস্তারা খসা বাড়িটা আমার। জানলার গ্রীলে মরচে। মেয়েকে ইংলিশ মিডিয়ামে দেওয়া গেল না। ছোট ছেলেটা বখাটে হয়েছে। বদমেজাজী স্বামী। খিটখিটে বউ। সব সুন্দরী মেয়েরা বাইকের পিছনে বসে চলে গেছে ন্যাশানাল হাইওয়ে ধরে বহুদূর। সব স্বপ্নের চাকরী বাগিয়ে নিয়েছে প্রতিবেশীরা। ফাটকা ব্যাবসায় বহু মাল কামিয়েছে দত্তবাড়ি। বেড়ার বাড়ি আজ মার্বেল বসানো। পরিবর্তনে গা ভাসিয়ে কেউ জুটিয়েছে স্কুলের শিক্ষকতা, কেউ কেউ পৌরসভার কন্ডাকটরি। বাজি লড়ে সে সময় সাইকেল নিয়ে চক্কর মেরেছিলাম বড় স্কুল মাঠে না থেমে ১০১ পাক। এখন বাজারে ঘুরে মরি সবচেয়ে সস্তার দোকান খুঁজে পেতে। বড়লোকে খরচা করে, গরীবরা হিসেব করে। রাতে খাওয়ার টেবিলে স্বামী স্ত্রী স্বপ্ন দেখে যদি হঠাৎ করে কিছু লাখ টাকা লটারী পাওয়া যায় তো কি কি করবে?

গালাগালি দিই এই সময়কে। কি আছে এখন ? আমার সময়ের মত লাল শাক নেই, বুঝলেন ফুটবল খেলে ফিরছি, গলগল করে রক্ত পড়ছে গোড়ালি ফেটে, একটুখানি বোরোলিন লাগাতেই পাঁচ মিনিটে রক্ত পড়া বন্ধ, দু ঘন্টায় সব শুকিয়ে সাফ, এখন তো সেটাও নেই। সবেতেই ভেজাল। গোলাপে গন্ধ নেই, শাঁসওয়ালা ডাব নেই, একটু বড় সাইজের ডিমওয়ালা ট্যাংরা মাছ নেই। এই যে বর্তমান সময়কে নিন্দে, এই যে নিজের সময় নিয়ে আত্মশ্লাঘা এছাড়া আমাদের আর কি আছে ? হাত আছে তবে সেটা হাতিয়ার নয়। আমরা বোম ছুঁড়তে পারি না। চোরকে খুঁটিতে বেধে পেটাতে পারি না। কেউ পেটালে বাঁধাও দিতে পারিনা। খবরের কাগজ পড়া বন্ধ করতে পারি শুধু। নিজের রাগ মেটাতে রাতের বেলায় ফুল ফ্যামিলি মিলে এই পোড়া সময়কে তেড়ে খিস্তি করতে পারি শুধু। এই সামান্য সম্বলটুকু আমরা ছাড়ব কেন? নইলে পরেরদিন আবার সেই ভীড় বাসে ট্রেনে ধাক্কা খাওয়ার শক্তি জোগাব কি করে?

Alone Man in Rainছুটিতে সকলে মিলে বেড়াতে চলেছি পাহাড়ে। রাতের বেলায় অন্ধকার চিঁড়ে ছুটে যাচ্ছে ট্রেন। সকলের ঘুমের মাঝ থেকে আমি উঠে চলে এলাম চলন্ত ট্রেনের দরজায়। দমকা হাওয়া এসে লাগলো মুখে। এক লহমায় চোখের সামনে ভেসে উঠল কালো ছাতাটা। ময়দানের প্রচন্ড বৃষ্টিতে যখন সকলেই আশ্রয় নিয়েছে চায়ের দোকানের শেডের তলায়, গাছের নিচে, বাড়ির বারান্দায়। একটি ছেলে একটি মেয়ে সামান্য একটা ছাতায় ভরসা করে হেঁটে চলেছে বৃষ্টির মধ্যে। সেই বিলম্বিত চুম্বনের শেষে ছেলেটি বাসে উঠে যাবে, মেয়েটি ঢুকে যাবে মেট্রোয়। তারা দুজনে কেউ জানে না এটাই তাদের শেষ দেখা। ব্যাস্ত মোড় এক ছুট্টে পার হয়ে গেল সে। ভীড়ের মাঝে হারিয়ে গেল। কিছুক্ষন ক্যাবলার মত দাঁড়িয়ে ফিরে এলাম বাড়িতে। প্রথম দেখা মনে থাকে, শেষ দেখা রয়ে যায় চোখের জলে। আমি কতবার ফিরে গেছি সে রাস্তায়। দাঁড়িয়ে থেকেছি একা। আমি এখনও দেখতে পাই সে চলে যাওয়া। পিছন ফিরে তাকিয়েছিল কি সে? এই ঝাপসা চোখে বোঝা যায় না সঠিক। শহরে হঠাৎ বৃষ্টি নামে, তার ছাঁট এসে লাগে ট্রেনে দাঁড়ানো এক সুখী মানুষের মুখে।



Popular Short Films and Music Videos
Atmiyo Short Film Amaro Porano Jaha Chay
Polatok - Short Film Atmiyo Theme Song
Mr Husband Short Film Poster Soniye Music Video
Astana Short Films How To Make a Low Budget Short Film
Anyo Loker Bou Poster How Much You Can Earn From Youtube